একাধারে প্রতিভাধর সাংবাদিক, ক্রীড়া সংগঠক, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। কি গুণ ছিল না তার মধ্যে? কিন্তু তিনি ছিলেন নিরঅহংকারী। কোনো দাম্ভিকতা ও লোভ লালসা ছিল না। একেবারে সাদাসিধা জীবনযাপন। এত গুণের অধিকারী মানুষটির নাম মরহুম আশরাফ উদ্দীন মকবুল। খুলনা সাংবাদিক সমাজের পথিকৃৎ। বৃহত্তর খুলনার সাতক্ষীরার তৎকালীন দরগাহপুর ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামে এক বুনিয়াদি পরিবারে ১৯৩৩ সাল ২০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ইন্তেকাল করেন ২০১৬ সালের ৪ মে। আজ তার দশম মৃত্যু বার্ষিকী।
তার পিতার নাম মরহুম গোলাম সরোয়ার সানা। একাধারে প্রায় ২০ বছর দরগাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের সভাপতি (চেয়ারম্যান) ছিলেন। আশরাফ উদ্দীন মকবুল লেখা পড়া করেছেন আশাশুনি স্কুল, বিএল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। যোগদান করেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে। মেধাবী এই ছাত্র নেতা ১৯৫৬-১৯৫৭ শিক্ষা বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এর জিএস নির্বাচিত হন।
ছাত্রজীবন শেষ করে আর রাজনীতির সাথে যুক্ত হন নাই। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। জীবনের প্রথম দিকে অল্পকিছু দিন আয়কর আইনজীবী হিসাবে কাজ করেছেন। কিন্তু শেষ মেষ সাংবাদিকতা বেছে নেন। যোগদান করেন পাকিস্তানের সরকারি নিউজ এজেন্সি এপিপিতে। যেটা এখন বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা)। তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ১৯৫৯ সালে মরহুম শামসুর রহমান ও মরহুম জহরুল হক সরদারের নেতৃত্বে খুলনার তখনকার বিখ্যাত হোটেল তৃপ্তি নিলয় বসে খুলনা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময় আরো যারা ছিলেন তাদের মধ্যে মাহমুদ আলম খান মুকু ভাই অন্যতম। তার সময়কালে তিনি একমাত্র জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহ সভাপতি ছিলেন।
খুলনায় তার সমসাময়িক সময়ে সাংবাদিকতা করেছেন মরহুম আবু সাদেক (সাদেক ভাই ছিলেন মকবুল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু)। মরহুম মনিরুল হুদা, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, নাসিরুদ্দিন, ফারুক আহমেদ, আইয়ুব হোসেন প্রমুখ। তার সময় ছিল অ্যানালগ যুগ। টেলিগ্রামের মাধ্যমে ঢাকায় খবর পরিবেশন করা হতো। অসম্ভব ইংরেজি জানা এই মানুষ টি একটা টাইপ রাইটার মেশিন নিয়ে বসে দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে নিউজ করে জুনিয়র সহকর্মী দের হাতে ধরিয়ে দিতেন। তারাই খুলনা সদর পোস্ট অফিসে যেয়ে টেলিগ্রামের ( টেলিটক্কা মেশিন) মাধ্যমে নিউজ পাঠিয়ে দিতেন। আমি নিজে দেখেছি মরহুম সাদেক ভাই ও মরহুম শাহাবুদ্দিন ভাই নিউজ করে মকবুল ভাইকে দেখিয়ে নিতেন। লেখা ঠিক আছে কিনা।
মকবুল ভাই নিজে ছিলেন স্বল্প আহারী। কিন্তু অপরকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। খুলনার ভাষায় বলতেন “খাও দিন বাঁচা খাও”। তিনি যখন ঢাকায় থাকতেন, খুলনার মানুষ পেলে খুব খুশি হতেন। তাদেরকে আপ্যায়ন না করে ছাড়তেন না।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের দাবি দাওয়া সাবেক স্পীকার মরহুম শেখ রাজ্জাক আলী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম মোস্তাফিজুর রহমানের অনুরোধে ইংরেজি অনুবাদ করে দিয়েছিলেন। ঢাকায় তার সমসাময়িক সাংবাদিকদের মধ্যে আনোয়ার জাহিদ, এবিএম মুসা, আতাউস সামাদ, হাবিবুর রহমান মিলন, গিয়াস কামাল চৌধুরী, রিয়াজুদ্দিন আহমেদ অন্যতম। মকবুল ভাইয়ের সহধর্মিণী লুতফুন নাহার মকবুল। তার শ্বশুর ছিলেন মরহুম আবুল কাশেম। তিনি একসময় খুলনার মহাকুমা প্রশাসক ছিলেন।
মরহুম আশরাফ উদ্দীন মকবুল ও লুতফুন নাহার মকবুল গর্বিত পিতামাতা। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে সরোয়ার ফিরোজ (সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা-মেজর), ছোট ছেলে মেজর জেনারেল সরোয়ার ফরিদ চাকরিরত। বড় মেয়ে আসপিয়া বুয়েট থেকে পাশ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে কিছুদিন শিক্ষকতা করে এখন আমেরিকায়। ছোট মেয়ে আফসানা রহিমা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। তার বউমা ও জামাইরা উচ্চ শিক্ষিত। আশরাফ উদ্দীন মকবুল বহু আশা নিয়ে খুলনা থেকে একটি ইংরেজি দৈনিক ও বাংলা দৈনিক বের করেছিলেন। কিন্তু খুলনার নোংরা পলিটিক্স পড়ে কাগজ দুটি চালাতে পারেন নাই। তিনি ঘুমিয়ে আছেন খুলনা নিরালা কবরখানায়। আল্লাহ মরহুম ভাইকে জান্নাত বাসী করুন।
খুলনা গেজেট/এনএম

